সারাবিশ্বেই পোষাপ্রাণি যেমন কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, পাখি ইত্যাদি পালন করার প্রবণতা দেখা যায়। একাকিত্ব ও মানসিক চাপ দূর করার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি তৈরীর এক বিশেষ ওষুধ হিসেবে কাজ করে পোষাপ্রাণি পালন। কিন্তু জীবন আছে যার, মৃত্যু তার জন্য অনিবার্য। আপনজন হারানোর মতোই প্রিয় প্রাণিকে হারানোর বেদনা সবাই সইতে পারে না। আয়ারল্যান্ডের মেইনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (MU) মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফিলিপ হাইল্যান্ডের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পোষা প্রাণীর মৃত্যুর পর সৃষ্ট শোক মানুষের মৃত্যুর মতোই গভীর ও কষ্টদায়ক হতে পারে।
গবেষণাটি যাদেরকে নিয়ে করা হয়েছে, তারা সবাই পোষা প্রাণীর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাদের মধ্যে ৯৩ শতাংশই কোনো না কোনো আপন মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতাও পেয়েছেন। যখন তাদের জিজ্ঞেস করা হয় কোন মৃত্যু তাদের সবচেয়ে বেশি মানসিক কষ্ট দিয়েছে, তখন তাদের ২১ শতাংশ পোষা প্রাণীর মৃত্যুকেই সবচেয়ে বেশি কষ্টদায়ক বলে উল্লেখ করেন।
‘No pets allowed: Evidence that prolonged grief disorder can occur following the death of a pet’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, পোষা প্রাণীর মৃত্যুর পর মানুষ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রার দীর্ঘস্থায়ী শোকজনিত ব্যাধি (Prolonged Grief Disorder বা PGD) তে আক্রান্ত হতে পারেন। PGD এর সাধারণ উপসর্গগুলো হলো, মৃত ব্যক্তির জন্য তীব্র আকুলতা এবং তাকে ঘিরে অতিরিক্ত চিন্তায় মগ্ন থাকা, প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রণা, অপরাধবোধ এবং কোনোভাবেই মৃত্যুকে মেনে নিতে না পারা। PLOS One জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের ৯৭৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে করা হয়। এতে দেখা যায়, পোষা প্রাণী হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে ৭.৫ শতাংশ PGD-এর নির্ণয়যোগ্য মানদণ্ড পূরণ করেছেন।
এই হারটি প্রায় সমান বা কাছাকাছি ছিল কাছের বন্ধুর মৃত্যু (৭.৮ শতাংশ), দাদা-দাদি বা নানা-নানির মতো পরিবারের সদস্যের মৃত্যু (৮.৩ শতাংশ), ভাই বা বোনের মৃত্যু (৮.৯ শতাংশ) এবং এমনকি জীবনসঙ্গীর মৃত্যু (৯.১ শতাংশ)-এর ক্ষেত্রেও। কেবলমাত্র বাবা-মায়ের মৃত্যু (১১.২ শতাংশ) এবং বিশেষভাবে সন্তানের মৃত্যু (২১.৩ শতাংশ) ক্ষেত্রে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক হাইল্যান্ড উল্লেখ করেন, মানুষ যে তাদের পোষা প্রাণীর সঙ্গে গভীর আবেগী সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং তাদের মৃত্যুর পর তীব্র শোক অনুভব করে। অথচ মানব চিকিৎসাবিজ্ঞানের PGD নির্দেশিকায় পোষাপ্রাণির মৃত্যুশোক বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অধ্যাপক হাইল্যান্ড মনে করেন, PGD-এর নির্দেশিকায় পোষা প্রাণীর মৃত্যুকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তিনি বলেন, “যেহেতু সাধারণ মানুষদের অনেকে পোষা প্রাণীর মৃত্যুসংশ্লিষ্ট শোককে মানুষের মৃত্যুর শোকের তুলনায় কম মনে করে এবং অনেকেই এ কারণে শোক প্রকাশে লজ্জা ও একাকিত্ব অনুভব করেন, তাই PGD-এর শোকসংক্রান্ত মানদণ্ড থেকে পোষা প্রাণীর মৃত্যুকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেবল বৈজ্ঞানিকভাবে ভুলই নয়, বরং নির্মম বলেও বিবেচনা করা যেতে পারে।”
মূল নিবন্ধ: Maynooth University ওয়েবসাইট